স্পন্সরড কন্টেন্ট যে কারণে বিবেচনা করবেন

সনাতন ওয়েব মিডিয়ায় মোটামুটি সবারই অর্থের বড় একটি অংশ আসে বিজ্ঞাপন থেকে। এক্ষেত্রে ব্যানার অ্যাডের প্রাধান্য দেখা যায় সচরাচর। ওয়েবসাইটে বিভিন্ন পণ্যের যে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়, সেখানে ক্লিক করলেই ঐ পণ্যের ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। কিন্তু নেট ইউজাররা বেশিরভাগ সময় অ্যাডগুলো একদম এড়িয়ে যান। এ ঘটনাকে ব্যানার ব্লাইন্ডনেস বলা হয়। ব্যানার ব্লাইন্ডনেসের ব্যর্থতায় তাই আজকাল জায়গা করে নিচ্ছে ন্যাটিভ অ্যাড বা স্পন্সরড কনটেন্ট।

ব্যানার ব্লাইন্ডনেস কী?

যখন নেট ইউজাররা সচেতন বা অবচেতনভাবে ব্যানার অ্যাড বা যেকোন ধরনের ওয়েবসাইটে ব্যানার জাতীয় কিছু এড়িয়ে যান, সে ঘটনাকে ব্যানার ব্লাইন্ডনেস বলে।

১৯৯৮ সালে বেনওয়ে ও লেইন এ শব্দটির জন্ম দেন। ওয়েবসাইট ব্যবহারের উপর গবেষণার পর তারা দেখতে পান যে ওয়েবপেইজে যে কোন ধরনের ব্যানার অ্যাড নেট ইউজাররা এড়িয়ে যাচ্ছেন। ওয়েবসাইটের যেখানেই দেয়া হোক না কেন, খুব একটা কার্যকরী ফলাফল যে পাওয়া যায় না, তাও উঠে আসে তাদের গবেষণায়।

ব্যানার অ্যাডের ব্যর্থতা

গত কয়েক বছর ধরেই পশ্চিমা বিশ্বে ডিজিটাল মার্কেটারদের মতে ব্যানার অ্যাড মানেই মার্কেটিং টাকার অপব্যয়। ব্যাপারটি বিভিন্ন গবেষণাতেও স্পষ্ট হয়। দেখা গিয়েছে, ভিজিটাররা কোন ওয়েবসাইটে গেলে ব্যানার অ্যাাডকে এড়িয়ে যান। আবার অভিজ্ঞ ইউজাররা ধীরে ধীরে ব্যানার অ্যাাড এড়ানোতে দক্ষ হয়ে উঠেন। “সল্ভ মিডিয়া”-এর মতে একজন ভিজিটরের ব্যানার অ্যাাডে ক্লিক করার সম্ভাবনা বিমান দুর্ঘটনায় তার মারা যাবার সম্ভাবনা থেকেও কম – ব্যানার অ্যাডে ক্লিক করার সম্ভাবনা থেকে বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে যাবার সম্ভাবনা ৪৭৫ গুণ বেশি!

২০০৭ সালে নিলসেন নরমান গ্রুপ নেট ইউজারদের চোখের নড়াচড়া পরীক্ষা করে একটি গবেষণা পরিচালনা করে ব্যানার অ্যাাডের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য। ফলাফলে দেখা গেছে যে মূল কন্টেন্টের বাইরে বিজ্ঞাপনের যে অংশ, সে অংশ বেশির ভাগ ভিজিটরদেরই নজর এড়িয়ে গেছে।

ব্যানার অ্যাডের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সম্ভবত নিউজ বা প্রিন্ট মিডিয়াগুলো। সাধারণত পত্রপত্রিকার আয়ের বড় একটা অংশ ছিলো বিজ্ঞাপন। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির প্রসারে বেশিরভাগ মানুষ ঝুঁকে পড়ে অনলাইন নিউজ মিডিয়ার দিকে। প্রিন্ট মিডিয়া মনে করেছিলো তাদের পুরানো বিজ্ঞাপন দেয়ার পদ্ধতি হয়তো আগের মতোই তাদের আয় বাঁচিয়ে রাখবে। কিন্তু তা ভুল প্রমাণিত হতে সময় লাগেনি। শুরুতে অনলাইনে ব্যবহারকারীরা নতুন হওয়ায় ব্যানার অ্যাাড ক্লিক থ্রু রেট (Click-through rate) ছিলো ৪৪%, যা ২০১০ সালে ০.১%-এ নেমে আসে। ২০১৬-১৭ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ০.০৫% এ। এটি বৈশ্বিক গড়। বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে কোন তথ্য না থাকায় কাছাকাছি দেশ ভারতকে রেফারেন্স ধরলে ২০১০ সালের হিসাব অনু্যায়ী এ সংখ্যা ০.১৮%!

ক্লিক থ্রু রেট = বিজ্ঞাপনে ক্লিক করা ভিজিটরের সংখ্যা ÷ মূল কন্টেন্টের মোট ভিজিটর সংখ্যা

কিছু পরিসংখ্যান

  • মাত্র ১৪% নেট ইউজার মনে করতে পারেন সর্বশেষ কোন বিজ্ঞাপন তারা দেখেছেন ও সেখানে কী প্রচারণা করা হয়েছিলো।
  • ব্যানার অ্যাডের ক্লিক থ্রু রেট মাত্র ০.১%
  • ৪৬৮ x ৬০ পিক্সেলের ব্যানার বা তার চেয়েও কম পিক্সেলের ব্যানার অ্যাডের ক্লিক থ্রু রেট আরো কম – ০.০৪%!
  • মোবাইল ডিভাইসে ব্যানার অ্যাডে যত ক্লিক করা হয়, তার ৫০ ভাগই ভুল করেই যায়।
  • বাংলাদেশে বেশিরভাগ অনলাইন পত্রিকায় বা মিডিয়ার অ্যাড ব্যানার অ্যাডের সাইজের উপর ভিত্তি করে কমপক্ষে ১০,০০০ টাকা/মাস থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা/মাস বা ততোধিক হতে পারে।

অ্যাড-অন (Add-on) ও অ্যাড ব্লক (Ad-block) দৌরাত্ম্য

বহু ওয়েবসাইটে এত বিজ্ঞাপন থাকে যে তা নেট ব্যবহারকারীদের বিরক্তির জন্ম দেয়। আজকাল তাই বেশ কিছু ওয়েব ব্রাউজার ইউজারদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অ্যাড ব্লকার এক্সটেনশান ব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছে। এদের অনেকেই আবার “রীডার ভিউ মোড”-এর অপশনও দিয়ে দিচ্ছে। ফলে শুধু মূল কন্টেন্ট সাধারণ টেক্সট আকারে পড়া সম্ভব হয়।

ব্রাউজার ভিউ পার্থক্য - কুইজার্ডস (Quizards)
ফায়ারফক্স ব্রাউজারের সাধারণ ভিউ ও রীডার ভিউয়ের মধ্যে পার্থক্য

মোবাইল ডিভাইসেও সরাসরি বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা দিনদিন কমছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যানার অ্যাাডের ফর্ম্যাট হলো ৩২০ x ৫০ পিক্সেল, যা স্ক্রিনের উপরে বা নিচে অবস্থান করে। যেহেতু দরকারী জিনিসের প্রতি মোবাইল ব্যবহারকারীদের আগ্রহ বেশি, ব্যানার অ্যাডের উপর তেমন গুরুত্ব দেন না তারা।

ব্যানার ব্লাইন্ডনেসের জন্য যে কোন ডিভাইসে ব্যানার অ্যাডের সুবিধা তাই বিজ্ঞাপনদাতা ও ডিজিটাল মার্কেটারদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।

স্পন্সরড কন্টেন্ট বা অ্যাডভারটোরিয়ালস সমাধান দিতে পারে কি?

ব্যানার ব্লাইন্ডনেস দূর করার জন্য মিডিয়া কোম্পানিগুলো নানা উপায় বের করেছে। যেমন, ওয়েবসাইটের নির্দিষ্ট জায়গায় অ্যাড, ন্যাটিভ অ্যাড, বিহ্যাভিয়ারাল অ্যাড ইত্যাদি। কন্টেন্ট নিয়ে যারা নিয়মিত কাজ করেন, তাদের কাছে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ন্যাটিভ অ্যাড যা স্পন্সরড কনটেন্ট। এটি অ্যাডভারটোরিয়াল নামেও পরিচিত, যদিও কিছুটা ভিন্নতা আছে এদের মধ্যে। নতুন কিছু না হলেও ব্যানার অ্যাডের ব্যর্থতার কারণে এ ধরনের পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

ন্যাটিভ অ্যাড ও স্পন্সরড কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম। এক অর্থে সব স্পন্সরড কন্টেন্ট ন্যাটিভ অ্যাড হতে পারে, কিন্তু সব ন্যাটিভ অ্যাডকে স্পন্সরড কন্টেন্ট বলা যায় না।

দুই ধরনের ফরম্যাটই হচ্ছে অর্থের বিনিময়ে বানানো কনটেন্ট। দুটোই কন্টেন্ট মার্কেটিংয়ের অংশ। এদের পার্থক্য নিয়ে আরো বিস্তারিত পড়তে পারেন হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে বা কন্টেন্টলিতে

স্পন্সরড অ্যাড বা ন্যাটিভ অ্যাডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো –

  • নেট ইউজারদের নেট ব্যবহারে তা কোন ব্যাঘাত ঘটায় না।
  • অ্যাড কনটেন্টের অংশ হওয়ায় নেট ইউজাররা নতুন কিছু জানতে পারেন।
  • বিজ্ঞাপনদাতা নিশ্চিত হতে পারেন যে ব্যবহারকারীরা তাদের প্রোডাক্ট সম্পর্কে জানছে।

টুইটারের প্রোমোটেড টুইট বা গুগলের সার্চ অ্যাড বা ফেসবুকের অ্যাড ন্যাটিভ অ্যাডের উদাহরণ হতে পারে। খ্যাতনামা নতুন মিডিয়া কোম্পানি বাজফিড ন্যাটিভ অ্যাডের ভিত্তিতেই তাদের বিজনেস মডেল দাঁড় করিয়ে টিকে আছে। আবার সুপরিচিত দি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার ওয়েবসাইট বলুন বা দি আটলান্টিক পত্রিকার ওয়েবসাইট বলুন, “স্পন্সরড কন্টেন্ট” ক্যাটাগরিতে তারা চমৎকার মানের প্রচুর কন্টেন্ট প্রকাশ করেন। দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ‘কোকেনমিক্স‘ এমন একটি উদাহরণ।

কোকেনমিক্স ইন্টারঅ্যাক্টিভ পোর্টাল - কুইজার্ডস (Quizards)
দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত “কোকেনমিক্স” নামক ইন্টারঅ্যাক্টিভ পোর্টালটি ছিলো নেটফ্লিক্সের “Narcos” ধারাবাহিকের জন্য বানানো স্পন্সরড কন্টেন্ট। ছবিটি ঐ পোর্টালের স্ক্রিনশট

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও কুইজার্ডসের ন্যাটিভ অ্যাড কৌশল

উপরের আলোচনা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার। নেট ইউজারদের ব্যবহারে সমস্যা তৈরি করায় ব্যানার অ্যাডের ব্যর্থতা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। বাংলাদেশে নেট ব্যবহারের ব্যাপক প্রসার শুরু হয়েছে কেবল মাত্র এক দশক বা তারও কম সময়ে। এখনো আমাদের দেশের প্রথম সারির মিডিয়া কোম্পানি বা ওয়েবসাইটগুলোর আয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ব্যানার অ্যাড। এ ব্যানার অ্যাডের খরচও বেশ চড়া – ১০ হাজার টাকা/মাস থেকে শুরু করে ১-৩ লাখ টাকা/মাস পর্যন্ত হতে পারে। তার উপর এ ব্যানার অ্যাডগুলো অল্প সময়ের জন্য হয়ে থাকে, যার বিপরীতে ন্যাটিভ অ্যাড বা স্পন্সরড কনটেন্টের মেয়াদ দীর্ঘদিনের। কোম্পানিগুলোর এ সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারে।

একদিকে ব্যবহারকারীদের বিরক্তি আর অন্যদিকে বিজ্ঞাপনদাতার অর্থের অপব্যয় – এ দুই বিবেচনায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশেও ব্যানার অ্যাড পদ্ধতি কাজে দেবে না বললেই চলে। তরুণ প্রজন্মের নেট ইউজাররা বাইরের বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারে আরো সচেতন হয়ে উঠছেন। ন্যাটিভ অ্যাড বা স্পন্সরড কন্টেন্ট ব্যবহার করা তাই বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ হতে পারে।

কুইজার্ডস ডট কোর শুরু থেকেই আমাদের অন্যতম চিন্তা ছিলো এর আর্থিক দিক নিয়ে – এটিকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে ওয়েবসাইটের আয়ের ব্যবস্থা করতেই হবে। কিন্তু আমরা নিজেরা উপলব্ধি করতাম যে ব্যানার অ্যাড সাইটের সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে ও আমাদের ইউজাররা বাজে অভিজ্ঞতা পেতে পারেন। এজন্য স্পন্সরড কন্টেন্ট বা অ্যাডভারটোরিয়ালসের দিকে যাওয়া বিবেচনা করেছি আমরা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে “কোয়ালিটি” কন্টেন্ট বানানো। গত ৩ বছর ধরে কোয়ালিটি কন্টেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে কুইজার্ডস কোন আপস করেনি। তাই দারুণ সব কুইজ, তথ্যমূলক আর্টিকেল বা ইনফোগ্রাফিক পেয়েছেন আমাদের ব্যবহারকারীরা।

আপনি যদি আপনার ব্র্যান্ড, কোম্পানি, সার্ভিস বা প্রোডাক্টের কথা কোয়ালিটি কন্টেন্টের মাধ্যমে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে যান, তাহলে আমাদের স্পন্সরড কন্টেন্ট সার্ভিস নিতে পারেন। ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠান বা স্টার্টআপের জন্যও আমরা রেখেছি বিশেষ ব্যবস্থা।

আমাদের সার্ভিস পেইজে গেলেই ফিচারগুলো দেখতে পারবেন।

লেখকঃ সাজ্জাদ হোসেন মুকিত, সহ-প্রতিষ্ঠাতা, কুইজার্ডস