আমার ‘ক্ল্যাসিক’ময় কৈশোর

আমার ক্ল্যাসিকময় কৈশোর - তারেক অণু, অতিথি লেখক, কুইজার্ডস (Quizards)

আজকের এ বিশেষ লেখাটি প্রকাশিত হলো আমাদের সেবা প্রকাশনী কুইজ উপলক্ষে। লেখাটির জন্য আমরা কৃতজ্ঞ লেখক তারেক অণুর প্রতি। স্বনামে বিখ্যাত তিনি। পাখিবিদ, অ্যাডভেঞ্চারার ও পর্যটক হিসাবে ঘুরেছেন বহু দেশে। অগ্রজ ইনাম আল হকের সাথে প্রথম বাংলাদেশি হিসাবে উত্তর মেরু জয় করেছেন। ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মঁ ব্লঁ আছে তাঁর অর্জনের তালিকায়। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন ‘পৃথিবীর পথে পথে’ ও ‘পথ চলাতেই আনন্দ’ নামের দুইটি বইয়ে। এছাড়া ইনাম আল হক স্যারের সাথে লিখেছেন ‘বাংলাদেশের পাখির ফিল্ডগাইড’।

তারেক অণু, অ্যাডভেঞ্চারার - কুইজার্ডস (Quizards)

আমাদের প্রিয় এ অভিযাত্রী সেবা প্রকাশনীর একজন বড় ভক্ত। এ লেখায় সে ভালোবাসাই ব্যক্ত করেছেন তিনি।

নিঝুম রাত। নিস্তব্ধতা চিরে লম্বা চাপা শিসের শব্দ!
“কে যায়?”
‘লাল পাঞ্জা হাক ফিন আর সাগরের আতঙ্ক জো হারপার।’
“সংকেত?”
‘রক্ত!

বুকের ভেতরে রক্ত ঝলকে ওঠে, কী ঘটতে যাচ্ছে এর পরে? তীব্র উত্তেজনায় চোখ বন্ধ করে খানিকক্ষণ কল্পনার চোখে দেখার চেষ্টা চালাই টম সয়্যারের জগত, পারি না! আবার ফিরে আসি বাস্তব পৃথিবীতে, নিউজ প্রিন্টের পেপারব্যাক বইটাতে, যা আজকের ভাড়া করে এনেছি একটি গোটা টাকার বিনিময়ে, কাল স্কুলের টিফিনের সময় ফেরত দিতেই হবে, না হলে এক টাকা জরিমানা, সবচেয়ে বড় কথা – আরেকটি বই পড়ার সুযোগ নষ্ট!

আবার দৌড় ঝাঁপ শুরু হয়, হাকলবেরি ফিন এসে যোগ দিয়েছে, আছে ডাকাতের দল, গুহার গুপ্তধন, প্রথম প্রেমের উচ্ছাস, কত কী! ইস, কতই বা হবে টমের বয়স, আমার সমানই! সবে হাই স্কুলে উঠেছে! ও ব্যাটা এত মজা করে, এত্তো এত্তো রোমাঞ্চ নিয়ে প্রতিটি দিন পার করে, আর আমার জীবনে কেবলই খাই-শুই-স্কুল-যাই! কত্তো বড় অন্যায়! যদিও টম না হতে পারার জন্য খুব একটা আফসোস হতো না, সবচেয়ে বড় হতাশা আসতো সুইস ফ্যামিলি রবিনসনের যে কোন একজন না হতে পারার জন্য! আহা, কী একখানা জীবন, জাহাজডুবির কবল থেকে উদ্ধার পেয়ে ক্রান্তীয় দ্বীপের স্বর্গরাজ্যে, পদে পদে শিহরণ, নতুন নতুন আবিস্কার, আর কী লাগে জীবনে? নিয়াজ মোরশেদের ঝরঝরে অনুবাদে বইটি অন্তত শখানেক বার পড়েছি নিজে সংগ্রহের পর, নীল সমুদ্দুরের লোনা গন্ধে ভুবন ভরিয়ে দিতো স্বপ্নময় গল্পটি।

শুধু এরাই না, রিক্সা ভাড়া বাঁচিয়ে কিনেছিলোাম ছয়খানা প্রজাপতি প্রকাশন থেকে বের হওয়া ল্যামিনেটেড মলাটের সংস্করণ – আলাস্কার তীক্ষ্ণ চাবুকের মতো বাতাস ফুঁড়ে পাশে এসে হাজির হতো বাক নামের বিশালকার বুদ্ধিমান কুকুরটা, যখন পড়তাম জ্যাক লন্ডনের দ্য কল অফ দ্য ওয়াইল্ড। কিউবার কোহিমার গ্রামের জেলে বুড়ো সান্তিয়াগোর দানবাকৃতির মার্লিন ধরার কসরত চোখের সামনে ফুটে উঠতো আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সীর মলাটে চোখ পড়লেই, রেনে জুই অর চিতা নিয়ে যেতো কেপু নামের এক সংবেদনশীল চিতাবাঘিনীর জগতে, আলেকজান্দার দ্যুমার দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স মানেই আর্থোস, পর্থোস, অ্যারামিস না হয় ডি’আরতানা আর তরবারির ঠোকাঠুকি। হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের সলোমনের গুপ্তধন নিয়ে যায় আমবোপা আর গাগুলের রহস্যময় রাজ্যে যেখানের মৃত্যু গুহাতে ঝিকমিক করে অগণিত হীরকখণ্ড! ৬ নম্বর বইটি ছিলো ফারলে মোয়াটের তিমির প্রেম, সুপাঠ্য একটি বই কিন্তু সেটি ছিলো আজব সিরিজের, সেবার কিশোর ক্ল্যাসিক নয়। আসলে সেবা প্রকাশনীর অনুবাদ এবং কিশোর ক্ল্যাসিক – এ দুই বিভাগ নিয়ে প্রায়ই গণ্ডগোল হয়ে যেতো, কোনটা ক্ল্যাসিক? কোনটা অনুবাদ? বোঝা মুশকিল কারণ একই লেখকের বই বের হয়েছে দুই বিভাগ থেকে, রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ডিক শেলটন এবং জোয়ানার কাহিনী কালো তীর যেমন ক্ল্যাসিকের নামে প্রকাশিত হয়েছিলোো, তেমনি একই লেখকের সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনা ট্রেজার আইল্যান্ড কিন্তু অনুবাদ বিভাগ থেকে বের হয়েছিলো! কেন? কে জানে! কিন্তু আজ লেখার চেষ্টা করছি আমার কৈশোর আর চলমান তারুণ্যকে কানায় কানায় অপার্থিব আনন্দে ভরিয়ে রাখার জন্য যাদের অবদান সবচেয়ে বেশী, সেই পেপারব্যাক বইগুলির, সেবা প্রকাশনীর কিশোর ক্ল্যাসিকগুলোর।

সেবার কিশোর ক্ল্যাসিকের যাত্রা শুরু হয়েছিলো বঙ্কিমের দুর্গেশ নন্দিনী দিয়ে, নিয়াজ মোরশেদ তার জাদুময় ভাষা দিয়ে কিশোর উপযোগী করে জগৎসিংহের অভিযানে আমাদের জড়িয়ে নিয়েছিলেন। আরো অনেক পরে পড়া হয়েছিলো সেবার কপালকুন্ডলা সংস্করণ, নবকুমারকে উদ্দেশ্য করে কি কপালকুন্ডলা সেখানেও বলেছিলো – “পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?” ঠিক মনে পড়ে না, কিন্তু মনে পড়ে রবিনসন ক্রুসো আর ফ্রাইডের কথা, সী উলফের পাগলা কাপ্তান লারসেন আর লেখক হামফ্রের কথা, রকিব হাসানের অনুবাদে রবার্ট মাইকেল ব্যালেন্টাইনের প্রবাল দ্বীপ এবং নিয়াজ মোরশেদের অনুবাদের গরিলা হান্টারস-এর তিন কিশোরের কথা, যদিও তাদের চেয়ে অনেক বেশী মনে দাগ কেটে গিয়েছিলো মামনুন শফিকের অনুবাদে এইচ দ্য ভের স্ট্যাকপোলের ব্লু লেগুনের সেই ছোট ছেলে-মেয়ে দুটির কথা, যারা সভ্য জগত থেকে অনেক অনেক দূরে থেকে নিজের আবিস্কার করে আদিম প্রথায়। মনে পড়ে কি আপনাদের এডমন্ড দান্তে নামের সেই একরোখা নাবিককে, যে কারাগার থেকে বিচিত্র উপায়ে পালিয়ে সমাজে ফিরেছিলো কাউন্ট অফ মন্ট্রিক্রিস্টো উপাধির আড়ালে? স্যার ওয়াল্টার স্কটের তালিসমান এবং আইভানহোতে ছিলো মধ্যযুগীয় ক্রুসেড, বনদস্যু, সুলতান সালাদিন, রাজা রিচার্ডের উপস্থিতিতে অন্য ধরনের আমেজ। কাজি মাহবুব হোসেন আমাদের সামনে তুলে ধরলেন গালিভার নামের এক নাবিককে, কোন দেশে সে দৈত্যাকার বাকীরা লিলিপুট, আবার অন্য অভিযানে সে নিজেই লিলিপুট আকৃতির, অন্যরা সেখানে দৈত্য!

মার্ক টোয়েনের টমের সাথে দেখা হলো নিয়াজ মোরশেদের কল্যাণে, টম সয়্যার নয়, টম ক্যানটি! রাজপুত্র এডওয়ার্ডের সাথে খেলাচ্ছলে পোশাক বদলের পরিপ্রেক্ষিতেই জন্ম নিয়েছিলো দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার এবং আমরা দেখেছিলোাম সেই সময়ের বিলেতে সাধারণ গরিব জনগণের দুর্দশার অকথ্য অবস্থা।

বাস্কারভিলের হাউন্ডের অতি অসাধারণ অনুবাদক আসাদুজ্জামান এক কিশোর ক্ল্যাসিকে তুলে ধরলেন সম্পূর্ণ বিপরীত দুই চরিত্রকে, অথচ একই মানব দেহে তাদের বাস! ডক্টর জেকিল এবং মিস্টার হাইড! মকবুলা মনজুরের কিশোর মহাভারত এবং কানাইলাল রায়ের কিশোর রামায়ণ পড়েছি অসংখ্যবার এবং মনে মনে ধন্যবাদ জানিয়েছি সেবাকে মহাকাব্য দুটোকে স্কুলপড়ুয়াদের উপযোগী করে প্রকাশের জন্য।

সারভান্তেসের ডন কুইক্সোট দিয়েছিলো অফুরান হাসির ভাণ্ডার এবং ভাবনার খোরাক, ভাল লেগেছিলো সাংকো পানযাকে, মনে মনে কদিন অন্য নামেই ডেকেছি কাছের বন্ধুদের যেমন ডন তার প্রেয়সীকে ডাকতেন দালসিনিয়া ডেল ট্যোবোসো নামে! মাথায় অ্যালুমিনিয়ামের গামলা দিয়ে কি জাদুকর ম্যামব্রিনোর শিরস্ত্রাণ মনে করেন নি আপনারা কেউ-ই কোন এক রোদেলা দুপুরে, যখন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে কাদা?

বাউন্টিতে বিদ্রোহ, মেন এগেনইস্ট দ্য সী আর পিটকেয়ানর্স আইল্যান্ড পড়ে প্রথমে খুব চটেছিলোাম বজ্জাত ক্যাপ্টেন ব্লাইয়ের উপরে, পরে খুব বেশী খারাপ লাগতো হতভাগ্য নাবিকগুলোর জন্য, কিন্তু তখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম সিংহ, টিনের সেপাইয়ের সাথে মিষ্টি মেয়ে ডরোথির সাথী হয়ে মহান শক্তিমান ওজের জাদুকরের কাছে যাবার জন্য যাতে বেচারি ঠিকঠাক বাড়ি ফিরতে পারে।

চার্লস ডিকেন্সের ইয়া মোটা মোটা বইগুলো আজ আমার বইয়ের তাক জুড়ে আছে কিন্তু পড়েছি সেবার অনুবাদগুলোই – টেল অফ টু সিটিজ, গ্রেট এক্সপেকটেশানস, ডেভিড কপারফিন্ড, ক্রিসমাস ক্যারল, অলিভার ট্যুইস্ট, নিকোলাই নিকলবি, দ্য পিকউইক পেপার্স – সবই, যদিও মনে হয়েছে খুব বেশী সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে কাহিনীগুলো, সাহিত্য রস অক্ষুণ্ণ রাখা সক্ষম হয়নি প্রায় কোনটাতেই, তবুও ভাল লেগেছিলো বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম সেরা লেখকের সৃষ্টিকর্মগুলোর সংক্ষিপ্ত রূপ জেনে!

কিন্তু খসরু চৌধুরীর অনুবাদে ভালোবেসে ফেললাম রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের অমর সৃষ্টি মৌগলি, নেকড়ে মা, চিতাবাঘ বাঘিরা, ভাল্লুক বালু, সর্দার একেলা, সাপ কা সবাইকেই, আর সুযোগ পেলেই গালিগালাজ করতাম ব্যাঙ খেকো বজ্জাত খোঁড়া বাঘ শেরে খানকে। ওয়াদারিং হাইটস, দ্য স্কারলেট পিম্পারনেল, জেন আয়ার, লিটল উইমেন, প্রাইড এবং প্রেজুডিস – সবার সম্পর্কেই জানা হলো সেবার কল্যাণে একটু একটু করে।

মাঝে অনেক বছর নতুন কোন ক্ল্যাসিক পড়া হয় না, অবশেষে ঢাকায় ফিরে ফ্র্যাঙ্ক পোলির নীল অন্ধকার পড়ে বেশ লাগলো, ফিরে আসলো যেন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে চাতকের মতো অপেক্ষারত কৈশোর। বুদ হয়ে গেলাম স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেনের রূপান্তরিত লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের বইগুলো পড়ে, পুরা লা-জবাব, সারাক্ষণের সঙ্গী তখন হয় আলমানযো না হয় লরা, আর প্রেইরির উম্মুক্ত বাতাস। তাদের সাথে খামারের কাজে মেতে উঠি, ডাকোটার শীত পাড়ি দিই, আপেলের রস দিয়ে তৈরি দারুণ সব খাবার খেয়েই যাই সারাটা দিন ধরে কল্পনায়।

সেবার ক্ল্যাসিকগুলোর মূল আকর্ষণ নিঃসন্দেহে ঝরঝরে গতিশীল অনুবাদ, ছন্দময় ভাষা, যার কারণে একাধিক মূল বই পড়েও শেষে ঘুরেফিরে ফের সেবাই অনুবাদেই আশ্রয় নিয়েছি, সারা জীবন হয়তো তাই-ই থাকতে হবে। আর একটা বিশাল আকর্ষণ ছিলো অসাধারণ প্রচ্ছদগুলো, মনের ভিতরে আশ্রয় গেড়ে বসতো একেবারে, সে নিয়ে কথা বলতে গেলে আরেক মহাভারত হয়ে যাবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

কিশোর ক্ল্যাসিকের বইগুলো আমার কাছে টাইম মেশিনের মতো, অন্য ভুবনের ছোট একটা জানালার মতো, যেখানে পৌঁছালেই জীবনের সবচেয়ে সুখের সময়, আমার কৈশোর ফিরে আসে হাসতে হাসতে, জানিয়ে দেয় সেই বিশ্বের কথা, যেখানে একঘেয়েমি বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই, আছে অতলস্পর্শী রোমাঞ্চ, অভিযান, বন্ধুত্ব। আছে অপার মুগ্ধতা, ভালো লাগা, ভালোবাসা।

আমাদের সেবা প্রকাশনী কুইজের তিন গোয়েন্দামাসুদ রানা কুইজ খেলতে পারেন চাইলে।

এ কন্টেন্টের ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

1
like
0
love
0
haha
1
wow
0
sad
0
angry

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here