সিডও সনদ: নারী স্বাধীনতার স্বীকৃতির সনদ

সিডও সনদ: নারী স্বাধীনতার স্বীকৃতির সনদ - কুইজার্ডস (Quizards)

নারী – শব্দটি শুধু একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গকেই নির্দেশ করেনা। এর সাথে জড়িয়ে আছে মানবজাতির একটি অংশের উপস্থিতি, পরিচয়, সত্ত্বা এবং জীবন সংগ্রামে সফলভাবে অংশগ্রহণের একটি মর্যাদা। একই মানবজাতির অংশ হয়েও আরেক অংশের কাছে প্রতিনিয়ত নারীদের প্রমাণ করতে হয়েছে তাদের জন্ম নেয়ার সার্থকতা। আজ থেকে ১০০ বছর আগেও নারীরা যা কল্পনাও করতে পারতেন না, আজকে তারা সেসব জায়গায় শুধু অংশগ্রণই করছেন না, নিজেদের কৃতিত্ব দেখিয়ে নারী ক্ষমতায়নে অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। এ পথ চলাটা কোনভাবেই সহজ ছিলনা, কিন্তু ‘নারী স্বাধীনতা’ শব্দটিকে মৌখিক দাবি থেকে আইনে পরিণত করে বৈশ্বিক ভাবে ‘নারী অধিকার’ – এ রূপান্তরিত করার পেছনে যেটির সবচেয়ে বড় অবদান তা হলো- ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে পাস হওয়া ঐতিহাসিক “The Convention on the Elimination of all Forms of Discrimination Against Women (CEDAW)” সনদটির। এই একটি সনদ আনুষ্ঠানিকভাবে সকল ক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি, অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে বৈধতা প্রদান করে।

পেছনের গল্প

সৃষ্টির শুরু থেকেই কিন্তু নারী-পুরুষের মাঝে এই বিভাজন রেখা ছিলোনা। ‘জেন্ডার রোল’ (gender role) টার্মটির মাধ্যমে নারীদের সবসময়েই পুরুষদের চেয়ে ছোট বা তাদের অধীনে করে রাখা হয় । অথচ সেই সময়ের মানুষের মস্তিষ্কে এই ধারনাই ছিলোনা। যার প্রমাণ প্রাচীনকালে কৃষিকাজ, শিকার – এর মত প্রভৃতি কাজে নারীদের অংশগ্রহণ দেখলেই বোঝা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পরপরই সারা বিশ্ব জুড়ে ‘মানবাধিকার’ নিয়ে সচেতনতা বেড়ে যায়। কোন যুদ্ধ কিংবা দেশ মানুষের জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান হতে পারেনা – মানবতার এই মৌলিক অভিপ্রায় আইনগত ভাবে বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে চলে আসে। এর ফলস্বরূপ ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘে সর্বসম্মতিক্রমে “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ” – বিলটি পাস হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের আর্টিকেল ২ “জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক বা অন্যান্য মতামত, জাতীয় বা সামাজিক উৎস, সম্পত্তি, জন্ম বা অন্য কোন অবস্থা নির্বিশেষে কোনও প্রকার বৈষম্য ছাড়াই এই ঘোষণায় উত্থাপিত সমস্ত অধিকার ও স্বাধীনতার অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে” – এই ঘোষণার মাধ্যমে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কিছুটা বৈধতা পায়। এরপরে ১৯৬৬ সালে “আন্তর্জাতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি” এবং “নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি” – বিষয়টিকে আরো কয়েকধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছিলো এই সনদ এবং চুক্তিগুলোই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারবে কারণ প্রত্যেকটিতেই নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের বিষয়ে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলা হয়েছে। কিন্তু এরপরেও জাতিসংঘের ভেতরে এবং বাইরে ক্রমশই নারীদের জন্য সম্পূর্ন আলাদা এবং সার্বজনীন একটি সনদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব হচ্ছিলো। যার করণেই ১৯৪৬ সালে গঠিত Commission on the status of women (CSW) কে একটি খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়।

এই কমিশন ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত নারীদের রাজনৈতিক অধিকার (১৯৫২); বিবাহিত নারীদের জাতীয়তা (১৯৫৭); বিবাহে সম্মতি, বিবাহের নূন্যতম বয়স ও বিয়ের নিবন্ধন (১৯৬২) – এর মত বিষয়গুলো জাতিসংঘের সাধারণ সভাগুলোতে পাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অবশেষে ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ সভার একটি তৃতীয় কমিটি এবং CSW একত্রে “The Convention on the Elimination of all Forms of Discrimination Against Women (CEDAW)” এর খসড়া লেখার কাজ শুরু করে। যা ১৯৭৯ সালের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ৩৪/১৮০ রেস্যুলেশনে, ১৩০-০ ভোটে পাস হয় যেখানে ১০ টি দেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে। এর পরপরই ১৯৮০ সালে কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে ৬৪ দেশের সাক্ষরের মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং ১৯৮১ সালে ৩০ টি সদস্য দেশ নিজেদের সংবিধানে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে CEDAW সনদের কার্যকারিতা শুরু হয়।

বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে ১৮৯ টি দেশ CEDAW সনদকে অনুমোদন দিয়েছে এবং ৯৯ টি দেশ সাক্ষর করেছে। এর মধ্যে ইরান, সোমালিয়া, সুদান এবং টঙ্গা সাক্ষর করেনি। আর একটি মজার ব্যাপার হলো, সারা বিশ্বের ওপর মানবাধিকার ও নারী অধিকার বিষয়ে ছড়ি ঘোরানোয় অগ্রজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এখনো নিজেদের সংবিধানে CEDAW সনদকে আনুষ্ঠানিক বৈধতা প্রদান করেনি। অথচ তারা এই সনদে সাক্ষর করা প্রথমদিকের দেশগুলোর একটি। এ পর্যন্ত এ বিলটি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট অধিবেশনে পাঁচবার আলোচনার জন্য তোলা হয়েছে এবং প্রত্যেকবারই পক্ষে দুই- তৃতীয়াংশের কম ভোট থাকায় এটি পাস হতে ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর CEDAW সনদকে নিজেদের সংবিধানে গ্রহণ এবং সংযোজন করার মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদান করে। কিন্তু বাংলাদেশ আর্টিকেল ২ “অনুমোদনকারী রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব আইনে লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ঘোষণা করে, সকল বৈষম্যমূলক বিধান বাতিল করে এবং নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য রোধে নতুন বিধান প্রণয়ন করে সনদটি অনুমোদন দিবে” এবং ১৬ (১গ) “বিয়ে ও পারিবারিক সম্পর্ক সম্পর্কিত সকল বিষয়ে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য দূর করতে রাষ্ট্রগুলো যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং বিশেষ করে, পুরুষ ও মহিলার সমতার ভিত্তি নিশ্চিত করবে” আর্টিকেল দুইটিকে শারিয়াহ আইনের সাথে সংঘর্ষের কারণে আনুমোদন দেয়নি। অথচ, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা কিন্তু শারিয়াহ আইন ভিত্তিক নয়।

শেষের কথা

একই ইচ্ছা, শব্দ, বাক্য যখন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্ত থেকে বারবার ইচ্চারিত হয়, তখন সেটা দাবিতে পরিণত হয় এবং এর যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। CEDAW সনদের স্বীকৃতি ছিলো দুনিয়ার কোটি কোটি নারীর বঞ্চনা মুক্তির এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার আইনি সনদ। এর হাত ধরেই জাতিসংঘের বিশেষায়িত অঙ্গসংস্থা The United Nations Entity for Gender Equality and the Empowerment of Women বা UN Women ২০১১ সালে এর যাত্রা শুরু করে। এখনো নারীদের সংগ্রাম প্রতিনিয়ত চলছে, ক্ষমতায়নের রয়েছে অনেকটা পথ বাকি; তবুও এই যাত্রা শুরুর পথে “The Convention on the Elimination of all Forms of Discrimination Against Women (CEDAW)” অসামান্য এবং অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে এবং এখনো করে চলেছে।

Loading

USAID Logo - কুইজার্ডস (Quizards)

This article is made possible by the support of the American People through the United States Agency for International Development (USAID.) The contents of this article are the sole responsibility of the Quizards project and do not necessarily reflect the views of USAID or the United States Government.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here