কিলো ফ্লাইট: মুক্তিযুদ্ধের স্মরণীয় এক নাম

কিলো ফ্লাইট - কুইজার্ডস

আমাদের মুক্তি সংগ্রামের শুরুর দিকে নিজস্ব কোন বিমান বাহিনী ছিলো না। এরপরও পাক বিমান বাহিনীতে কর্মরত বহু বাঙালি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভাবে অবদান রেখেছেন। বায়ুসেনা হয়েও স্থলবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন তাঁরা। তাঁদের সাহসিকতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম ইউনিট। কিলো ফ্লাইট ছিলো এর নাম। এ ইউনিটের মাধ্যমে প্রায় ৫০টির মতো সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছিলো। আজ আমরা জানবো কিলো ফ্লাইট ইউনিটের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

যেভাবে শুরু

রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৬নং সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন উইং কমান্ডার বীর উত্তম খাদেমুল বাশার (পরবর্তীতে এয়ার ভাইস মার্শাল ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান)। ঢাকার তেজগাঁওয়ের বাশার বিমানঘাঁটি তাঁর নামেই নামকরণ করা। অন্যদিকে যুদ্ধের শেষ দিকে মেজর তাহের আহত হলে স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ খান ১১নং সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

যুদ্ধের সময় এক দুঃসাহসিক চিন্তা তাঁদের মাথায় আসে – স্বাধীন দেশের স্বাধীন বিমান বাহিনী গঠন করবেন তাঁরা। মুজিবনগর সরকারের সাথে তাঁরা এ ব্যাপারে যোগাযোগ করেন। আলোচনা বসে প্রবাসী সরকার ও ভারতের মধ্যে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিবেচনা করে ভারত প্রস্তাব দেয় তাদের বিমান বাহিনীর অধীনে লড়াই করতে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর কোন বিমান আমাদের সেনারা সরাসরি ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি হবে ও প্রশ্নবিদ্ধ হবে মুক্তিযুদ্ধের গ্রহণযোগ্যতা – এমন ধারণা থেকে এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু অন্য দেশের উর্দি পড়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি বাঙালি পাইলটরা। থমকে যায় এ উদ্যোগের অগ্রগতি।

অনেকটা হঠাৎ করে ১৯৭১ এর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে স্বাধীন বিমান বাহিনী গঠনের জন্য ১টি পুরানো ডিসি-৩ বিমান, ১টি অটার বিমান ও ১টি অ্যালুয়েট-৩ হেলিকপ্টার দেয়। এর সাথে ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের ডিমাপুরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত একটি রানওয়ে ব্যবহারেরও অনুমতি মেলে। অবশেষে ২৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। এ বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার।

ভারতের এমন মত পরিবর্তনে যাঁর প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিলো, তিনি হলেন তৎকালীন ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রধান প্রতাপ চন্দ্র লালের (পি. সি. লাল) বাঙালি স্ত্রী ইলা লাল। যুদ্ধের মাঝে একদিন তিনি কলকাতায় এলে তাঁর সাথে দেখা হয় বাঙালি পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সদরুদ্দিনের সাথে। তিনি ভদ্রমহিলাকে আমাদের নিজস্ব বিমানবাহিনীর প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝাতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে ইলা লালই তাঁর স্বামীকে প্রভাবিত করেন এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য। কৃতজ্ঞতা এ বাঙালি নারীর প্রতি।

কিলো ফ্লাইট: প্রস্তুতি পর্ব

কিলো ফ্লাইট: স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ - কুইজার্ডস

বিমানগুলোকে যুদ্ধোপযোগী করার জন্য বিভিন্ন সেক্টর থেকে যুদ্ধরত মোট ৫৮ জন বিমানসেনাকে একত্র করে গঠিত হয় একটি ইউনিট। নাম দেয়া হয় “কিলো ফ্লাইট”। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ (ইনিও পরবর্তীকালের এয়ার ভাইস মার্শাল ও বিমান বাহিনী প্রধান) এর নেতৃত্ব পান।

কিলো ফ্লাইট: অটার বিমান - কুইজার্ডস

কানাডার তৈরি অটার বিমানটি ছিলো মূলত বেসামরিক। রকেট পড লাগিয়ে এটিকে বোমারু বিমানে পরিণত করেন আমাদের বিমানসেনারা। পেছনের দরজা খুলে লাগানো হয় মেশিনগান। এছাড়া ২৫ পাউন্ডের ১০টি বোমা ফিট করা হয় অটারের মেঝের পাটাতন খুলে। অবশ্য বোমাগুলো স্বয়ংক্রিয় ছিলো না। হাত দিয়ে পিন খুলে নিক্ষেপ করতে হতো।

কিলো ফ্লাইট: অ্যালুয়েট-৩ হেলিকপ্টার - কুইজার্ডস

ছোট আকৃতির অ্যালুয়েট-৩ হেলিকপ্টারটি ফ্রান্সের তৈরি। আগে বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা হতো এটি। এতে মেশিনগান ও রকেট পড যোগ করা হয়। সাথে ছিলো ২৫ পাউন্ড ওজনের বোমা ফেলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। খুব নিচু দিয়ে উড়তে হয় বলে নিরাপত্তার জন্য এর তলদেশে এক ইঞ্চি পুরু স্টিল প্লেট লাগানো হয়।

আমেরিকায় তৈরি ডাকোটা বা ডিসি-৩ ছিলো যোধপুরের মহারাজা গজ সিংজির ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিমান। এ মহানুভব ব্যক্তি তা দান করেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য। এটি মূলত পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিলো। পর্দার অন্তরালের এ মানুষটির প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।

দুর্দান্ত এক অভিযানের কথা

ট্যাকটিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি ও নারায়ণগঞ্জের তেল ডিপোগুলো ধ্বংসের দায়িত্ব দেয়া হয় কিলো ফ্লাইটকে। উল্লেখ্য, এ দুই জায়গায় মুক্তিবাহিনীর একাধিক অপারেশন এর আগে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিলো। তাই এ অভিযানের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, মধ্যরাত। চট্টগ্রাম বন্দরে থাকা পাকিস্তান নৌবাহিনীর গানবোট ও জাহাজের এন্টি-এয়ার গান ফাঁকি দিয়ে পুরানো আমলের ন্যাভিগেশন সিস্টেমের উপর নির্ভর করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অটারটি চট্টগ্রাম পৌঁছে যায়। ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন, ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম ছিলেন বিমানের আরোহী হিসাবে। ইস্টার্ন রিফাইনারির কাছে পৌঁছাতেই গর্জে ওঠে রকেট পড। জ্বলে ওঠে ট্যাংকারগুলো। সে রাতে বহু মাইল দূর থেকেও দেখা গিয়েছিলো আগুনের আভা। শোনা যায়, পুরো তেলের স্টক শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলেছিলো সেখানে – একটানা তিন দিন।

এখনকার সময়েও রাতে হেলিকপ্টার চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কিন্তু কিলো ফ্লাইটের লিডার সুলতান মাহমুদের পরিচালনায় কোন রকম বিপদ ছাড়া প্রায় একই সময়ে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে পৌঁছায় অ্যালুয়েট হেলিকপ্টারটি। এ মিশনে তাঁর সাথে ছিলেন ক্যাপ্টেন সাহাব উদ্দিন ও ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলম। তেলের ট্যাংকারের ওপর তাঁদের বোমা নিক্ষেপের মুহূর্তের মধ্যে সেগুলো বিস্ফোরিত হয়।

এমন পরিকল্পিত বিমান আক্রমণ প্রতিহত করার কোন পূর্বপ্রস্তুতি ছিলো না পাকিস্তান বাহিনীর। হতভম্ব হানাদারেরা কিছু বুঝে ওঠার আগে অটার আর অ্যালুয়েট মিশন শেষ করে নিরাপদ স্থানে ফিরে যায়। জন্ম হয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের আরেকটি বীরত্বগাঁথার।

এ পোস্টের মূল লেখক ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ও কুইজার জয়ন্ত সেন আবীর।