করোনাভাইরাস সম্পর্কিত শব্দগুলোর অর্থ

করোনাভাইরাস শুধু নতুন একটি রোগ হিসেবেই আবির্ভাব হয়নি, নিয়ে এসেছে একগাদা প্রায় অপরিচিত শব্দও। শব্দগুলোর অর্থ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বোধ্যও ঠেকছে বাংলা ভাষায় উপযুক্ত প্রতিশব্দ না থাকায়। তাই আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হয়েছে করোনাভাইরাস ও এর মতো ছোঁয়াচে রোগের ক্ষেত্রে প্রচলিত শব্দগুলোর বাংলা সহজবোধ্য অর্থ বের করার।

সার্স-কোভি-২

করোনাভাইরাস সম্পর্কিত শব্দগুলোর অর্থ: সার্স-কোভি-২ - কুইজার্ডস (Quizards)

সার্স-কোভি-২ (SARS-CoV-2) হলো একটি RNA ভাইরাস, যা বর্তমানে সৃষ্ট কোভিড-১৯ কিংবা করোনা মহামারি সৃষ্টির জন্য দায়ী। এর দেহের চারদিকে গ্লাইকোপ্রোটিনের বিভিন্ন শিক বা স্পাইক থাকায় ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপে একে দেখতে একটি রাজমুকুটের মতো লাগে। এজন্যই এর নাম করোনা, যার অর্থ দেয়া হয়েছে “রাজমুকুট”।

কোভিড-১৯ 

কোভিড-১৯ (COVID-19) হচ্ছে এমন সব শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত জটিলতার সমষ্টি যা সার্স-কোভি-২ ভাইরাসটি তৈরি করতে পারে। কিন্তু সবসময় যে এ জটিলতাগুলো বা উপসর্গগুলো দেখা দেবে, ব্যাপারটা এমন না। 

সার্স-কোভি-২ আর কোভিড-১৯ – এ দুটো বিষয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, একটি ভাইরাসের নাম, অপরটি অসুখের জটিলতার সমষ্টি।

আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্নকরণ

করোনাভাইরাস সম্পর্কিত শব্দগুলোর অর্থ: কোয়ারেন্টাইন - কুইজার্ডস (Quizards)

করোনাভাইরাস রোগাক্রান্ত হলে বা রোগের একাধিক লক্ষণ প্রকাশ পেলে রোগীকে সম্পূর্ণ আলাদা করে চিকিৎসা দেয়া হয়। এ সময় চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে থাকতে হয় রোগীকে। এ অবস্থাকে আইসোলেশন (Isolation) বলে।

সাম্প্রতিক সময়ে সেলফ-আইসোলেশনের কথাও উঠে এসেছে। অনেক সময় দেখা যায়, একজন করোনাভাইরাস রোগী চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে সঠিক পথ্য অনুসরণ করে আর বাসায় বিশ্রামে থেকেও সুস্থ হতে পারেন। এ অবস্থাকে সেলফ-আইসোলেশন বলে।

কোয়ারেন্টাইন বা সঙ্গনিরোধ

করোনাভাইরাসের রোগীর সংস্পর্শে এসেছে বা জীবাণু ধরা পড়ার সুযোগ আছে এমন ব্যক্তিদের রোগের সংক্রমণ হয়েছে কিনা এটা জানার জন্য বিশেষভাবে আলাদা করে রাখা ও চলাচল সীমিত করাকে কোয়ারেন্টাইন বলা হয়।

আপনারা যদি ড্যান ব্রাউনের ‘Inferno’ উপন্যাসটি পড়ে থাকেন, তাহলে জানার কথা যে, কোয়ারেন্টাইন (Quarantine) শব্দের উৎপত্তি ইতালিয় শব্দ Quaranta থেকে, যার অর্থ চল্লিশ।

জানা যায়, প্লেগের সময় ইতালির বন্দরে কোন জাহাজ ভিড়লে জাহাজের নাবিক ও নাবিকদের একটি দ্বীপে চল্লিশ দিন আলাদা করে রাখা হতো তাদের মধ্যে প্লেগের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। সেখান থেকেই কোয়ারেন্টাইন শব্দটি এসেছে।

এপিসেন্টার বা কেন্দ্রস্থল

করোনাভাইরাস সম্পর্কিত শব্দগুলোর অর্থ: এপিসেন্টার - কুইজার্ডস (Quizards)

যদি কোনও দেশ বা অঞ্চলকে মহামারি রোগের এপিসেন্টার (Epicenter) বা কেন্দ্রস্থল বলা হয়, তার অর্থ হচ্ছে সেখানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নিশ্চিত সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গিয়েছে এবং সেখান থেকে অন্যান্য স্থানে রোগ ছড়ানোর নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে।

কখনও কখনও কেন্দ্রস্থল বা এপিসেন্টারকে হটস্পটও বলা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সম্প্রতি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট নারায়ণগঞ্জ জেলাকে এপিসেন্টার হিসেবে ধারণা করেছিলো।

কন্টাক্ট ট্রেসিং

কন্টাক্ট ট্রেসিং বলতে সে সমস্ত লোকের সন্ধান করা বোঝায় যারা কোন রোগাক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সরাসরি সংস্পর্শে এসেছিলো। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের কন্টাক্ট বলা হয়ে থাকে এ ক্ষেত্রে।

রোগাক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা এ মানুষদের (কন্টাক্ট) কিছু নির্দিষ্ট দিনের জন্য জনবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় যেন তাদের থেকে আরো মানুষের মধ্যে সে রোগের সংক্রমণ না ঘটে।

অ্যাসিম্পটোমেটিক বা উপসর্গহীন রোগী

করোনাভাইরাস সম্পর্কিত শব্দগুলোর অর্থ: অ্যাসিম্পটোমেটিক বা উপসর্গহীন রোগী - কুইজার্ডস (Quizards)

অ্যাসিম্পটোমেটিক অর্থ রোগের কোনও উপসর্গ বা লক্ষণ না দেখানো। কোন রোগীর মধ্যে রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ যদি না প্রকাশ পায়, তাকে অ্যাসিম্পটমোটিক বা উপসর্গহীন রোগী বলে। তবে তার অর্থ এটা নয় যে সে ব্যাক্তি কোন রোগে সংক্রমিত হননি।

আমরা জেনেছি কোভিড-১৯ হচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত জটিলতার সমষ্টি যা সার্স-কোভি-২ ভাইরাসটি তৈরি করতে পারে। কিন্তু সবসময় যে এ জটিলতাগুলো বা উপসর্গগুলো দেখা দিবে ব্যাপারটা এমন না। অর্থাৎ কোভিড-১৯ আক্রান্ত অ্যাসিম্পটমোটিক বা উপসর্গহীন রোগী থাকার সম্ভাবনা বেশ প্রবল।

এ ধরনের রোগী থেকে করোনাভাইরাস রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা আরো বেশি থাকে।

ক্লোরোকুইন

ক্লোরোকুইন একটি ওষুধ যা ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি করোনভাইরাসের সম্ভাব্য ওষুধ হিসাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষাধীন অবস্থায় রয়েছে।

ক্লোরোকুইনের  রাসায়নিক সূত্র C18H26ClN3। একে মাঝে মাঝে CQ হিসাবে সংক্ষিপ্ত করেও প্রকাশ করা হয়ে থাকে। ক্লোরোকুইনের একটি ডেরাইভেটিভ হচ্ছে হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন।

ম্যালারিয়ার রোগের জন্য দায়ী পরজীবী দূরীকরণে ক্লোরোকুইন কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিলো, যা পরবর্তীতে সার্স রোগের চিকিৎসাতেও কার্যকারিতা দেখায়। সার্স ও কোভিড-১৯ দুটি রোগের ভাইরাস একই গোত্রের হওয়ায় ক্লোরোকুইনকে নভেল করোনাভাইরাস এর চিকিৎসায় ব্যবহার করার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। 

করোনাভাইরাস সম্পর্কিত শব্দগুলোর অর্থ: ক্লোরোকুইন - কুইজার্ডস (Quizards)

কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সম্প্রদায়ে বিস্তার বা সঞ্চালন

করোনাভাইরাস সম্পর্কিত শব্দগুলোর অর্থ: কমিউনিটি ট্রান্সমিশন - কুইজার্ডস (Quizards)

যখন কোন রোগের সংক্রমণের উৎস অজানা থাকে ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিস্তার বা সঞ্চালন ঘটতে থাকে, তাকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সম্প্রদায়ের বিস্তার বা সঞ্চালন বলা হয়।

সহজ ভাষায়, একটি মানুষের গোত্রে বা এলাকায় যখন এতই বিশাল সংখ্যক মানুষ একটি রোগে আক্রান্ত থাকে যে কার আসলে রোগটি আছে বা নেই সেটি টেস্ট ছাড়া নির্দিষ্ট করে বলা যায় না এবং সম্ভাবনার সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে ঐ জনগোষ্ঠীর যে কেউই আক্রান্ত বলে বিবেচিত হতে পারে এ অবস্থাকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলে।

এপিডেমিওলজি বা মহামারি বা রোগবিস্তার-সংক্রান্ত বিদ্যা

এপিডেমিওলজি হলো চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি শাখা যা কোন জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে রোগের প্রকোপ ও বিস্তারের নিয়ে গবেষণা করে এবং কোন সংক্রামক রোগের মহামারির উৎস আর কারণ সনাক্ত করে। এপিডেমিওলজিস্ট হচ্ছেন এমন ব্যক্তি যিনি মহামারি বা রোগবিস্তার নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণা করেন।

ফ্ল্যাটেন দি কার্ভ বা বক্ররেখা সমতলকর

ফ্ল্যাটেন দি কার্ভ বা (মহামারি) বক্ররেখা সমতলকরণ করার অর্থ একটি মহামারি রোগের বিস্তারকে ধীর করে দেওয়া যাতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা একসাথে বড় সংখ্যক রোগীর চাপে ভেঙে না যায়। 

মহামারির বিস্তার যদি ধীর না করা হয়, তাতে একসাথে অনেক রোগী খুব অল্প কিছু দিনে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হবেন। তাতে হাসপাতালগুলো একসাথে এদের সবাইকে চিকিৎসা দিতে পারবেন না। দেখা যাবে স্বাভাবিক সময়ে যে স্ট্রোক বা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেয়া যেতো, মহামারির সময়ে তাদেরও চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে না। এতে মহামারি ছাড়াও অন্যসব রোগে ও দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগীও তুলনামূলকভাবে বেশি মারা যাবেন। 

করোনাভাইরাস সম্পর্কিত শব্দগুলোর অর্থ: ফ্ল্যাটেনিং দি কার্ভ - কুইজার্ডস (Quizards)

হার্ড ইমিউনিটি বা গোত্রীয় অনাক্রম্যতা

হার্ড ইমিউনিটি বা দলীয়/গোত্রীয় অনাক্রম্যতা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে যখন একদল মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠবে এবং তাদের ঐ রোগটির প্রতি প্রতিরোধক্ষম হয়ে ওঠার কারণে সমাজের বাকিদের মধ্যে রোগটির সংক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে। 

লেখকঃ সাজ্জাদ হোসেন মুকিত, সালমান আব্দুল্লাহ ও আকিব মো. সাতিল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here