in , ,

আল-আন্দালুসের গল্প

দায়নিসিও বায়েক্সিরাসের আঁকা La civilització del califat de Còrdova en temps d'Abd-al-Rahman III/উইকিমিডিয়া কমনস

সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতির আবিষ্কারক আল জাহরাউই, স্বচ্ছ কাঁচ তৈরির প্রক্রিয়ার উদ্ভাবক ইবনে ফিরনাস কিংবা দার্শনিক ইবনে রুশদ যিনি পশ্চিমা বিশ্বে আভিরোস নামে পরিচিত – এরা সবাই ছিলেন একই অঞ্চলের বাসিন্দা, আল-আন্দালুস। আইবেরিয়া তথা বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল দেশ দুইটিকে নিয়ে যে উপদ্বীপ, সেখানে একটা সময় ছিল মুর নামে পরিচিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর শাসন। তখন এই অঞ্চলের নাম ছিল আল-আন্দালুস। এই আল-আন্দালুস এক পর্যায়ে পরিণত হয়েছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানের মিলন কেন্দ্রে (conduit)।

কীভাবে গোড়াপত্তন হয়েছিল আল-আন্দালুসের। কেনইবা কালের গর্ভে হারিয়ে গেল এই অঞ্চলের এক সময়ের সমৃদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের কেন্দ্রগুলো। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে এই লেখায়। লেখাটির শেষে আছে একটি সংক্ষিপ্ত কুইজ।

জাবাল আল-তারিক

ভূগোল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তারা জিব্রালটার প্রণালীর কথা বহুবার শুনেছেন। এই প্রণালীর নামকরণ হয়েছে আইবেরিয়া উপদ্বীপের দক্ষিণে জিব্রাল্টার পাহাড়ের নামে। এই জিব্রাল্টার শব্দটি এসেছে আরবি জাবাল আল-তারিক, বা তারিকের পাহাড় থেকে। 

কথিত আছে স্পেনের ভিসিগোথ রাজা রদরিকের বিরুদ্ধে জুলিয়ান নামে একজন স্থানীয় শাসকের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে তিনিই উমাইয়া শাসকদের স্পেন আক্রমণের আহ্বান জানান। এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, উমাইয়া শাসনামলে বিখ্যাত সমরবিদ তারিক ইবনে জিয়াদ যে মরক্কো থেকে একটি সেনাদল নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী পাড়ি দিয়ে স্পেনের দক্ষিণে জাহাজের বহর নিয়ে অবতরণ করেছিলন সে বিষয়ে কোন প্রশ্ন নেই।

তারিক ইবনে জিয়াদের সাথে যুদ্ধে স্পেনের দক্ষিণ অংশের রাজা রদরিক পরাজিত এবং নিহত হতে স্পেনে উমাইয়া শাসনের সূচনা হয়। উমাইয়াদের উত্তর আফ্রিকা অঞ্চল, যা মাগরেব নামে পরিচিত, থেকে বহু নাগরিক জিব্রাল্টার প্রণালী পাড়ি দিয়ে স্পেনে আসেন। মাগরেব থেকে আসা এই ব্যক্তিদেরকে ইউরোপীয় ইতিহাসবিদেরা মুর নামে চিহ্নিত করেন। এই মুর গোষ্ঠী পরে স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্র্যান্সের কিছু অংশ দখল করে আল-আন্দালুস প্রদেশ গড়ে তোলে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র

আরব অঞ্চলের মুসলিম শাসকদের মধ্যে খেলাফত নিয়ে বিরোধ ও বারবার বিদ্রোহের প্রভাব পড়ে আল-আন্দালুসেও। এই সময় আব্বাসীয়দের আক্রমণে উমাইয়া খেলাফতের পতনের পর উমাইয়া যুবরাজ প্রথম আব্দুর রহমান আল-আন্দালুসে আসেন এবং রাজধানী কর্দোবা দখল করেন। এরপর থেকেই কর্দোবায় বিভিন্ন বিষয়ে অধিকতর গবেষণা ও বিজ্ঞান চর্চার একটা কেন্দ্র ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠতে শুরু করে যার পূর্ণতা পায় দশম শতাব্দীতে তৃতীয় আব্দুর রহমানের সময়। 

যারা গেম অফ থ্রোনস দেখেছেন, তারা হয়তো ডর্নের রাজপ্রাসাদের ভেতরের টেরাকোটায় আরব স্থাপত্যকলার ছাপ দেখেছেন। আলকাজার নামের এই প্রাসাদটিও এই আল-আন্দালুসেই অবস্থিত। আরবি আল-কাসর শব্দটির অর্থ হচ্ছে দুর্গ। তৃতীয় আব্দুর রহমানের সময় খ্রিস্টানদের এই ধর্মীয় স্থাপনাকে দুর্গের মত সুরক্ষিত করে প্রাসাদে রূপান্তর করা হয়। ইউরোপে এই স্থাপত্যকলাকে ‘মুরিশ আর্কিটেকচার’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। এমন বেশ কিছু বিখ্যাত স্থাপনা যেমন স্পেনের গ্রেট মস্ক অফ কর্দোবা, কোর্ট অফ দি লায়নস ইত্যাদি মুরিশ আর্কিটেকচারের উদাহরণ।

এই সময়ে আল-আন্দালুসে গড়ে উঠেছিল খলিফা দ্বিতীয় আল হাকামের উদ্যোগে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি যেখানে চার লক্ষের বেশি বই ছিল বলে জানা যায়। ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞান আহরণের উদ্দেশ্যে আগ্রহীরা কর্দোবায় ভিড় করতেন। কর্দোবা তখন কনস্ট্যান্টিনোপোলের চেয়েও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয় বলে অনেক ইতিহাসবিদ দাবি করে থাকেন।

এছাড়া সঙ্গীত, সাহিত্য, ইসলামি চিত্রকলা, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ের পণ্ডিত ও গবেষকদের কর্দোবার শাসকের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হত। দার্শনিক ইবনে রুশদ, উদ্ভাবক ইবনে ফিরনাস, চিকিৎসক আল জাহরাউই, সঙ্গীতজ্ঞ জিরিয়াব, সাহিত্যিক আল-কাস্তালি প্রমুখ আল-আন্দালুস অঞ্চল থেকেই উঠে এসেছিলেন।

পুনরুদ্ধার

খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী ভিসিগোথ শাসকদের হাতছাড়া হওয়ার পর থেকেই আইবেরিয় উপদ্বীপ অঞ্চল মুরদের হাত থেকে পুনরুদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন পার্শ্ববর্তী খ্রিস্টধর্মীয় শাসকেরা। তাদের এই চেষ্টাকে ইতিহাসে Reconquista, অর্থাৎ পুনঃদখল বা পুনরুদ্ধার নামে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। 

আল-আন্দালুসের অধিবাসী আরব ও বারবারদের মধ্যে শুরু থেকেই জাতিগত দূরত্ব ছিল। পরে বারবার বিদ্রোহের সময় এই দূরত্ব সংঘর্ষে রূপ নেয়। এছাড়াও আল-আন্দালুসের বিভিন্ন অঞ্চলের মুর মুসলিম শাসকেরাও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন। ফলে দুর্বল হতে থাকে সেখানে মুরদের অবস্থান। এদিকে পার্শ্ববর্তী খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী শাসকেরাও বিভিন্ন যুদ্ধে মুরদের প্রতিহত এবং পরাজিত করতে থাকে। 

অবশেষে পঞ্চদশ শতকে গ্রানাডার পতনের মধ্য দিয়ে মুরদের শাসনের অবসান ঘটে আইবেরিয় উপদ্বীপ। রাজা ফার্দিনান্দ ও রানী ইসাবেলার যৌথ শাসনে স্থানীয় মুসলিম ও ইহুদী জনগোষ্ঠীর উপর দেশছাড়ার চাপ ও অত্যাচার বাড়লে তারা দলে দলে দেশত্যাগ করে উত্তর আফ্রিকায় চলে যায়।

এভাবেই শেষ হয় আল-আন্দালুসের ইতিহাস। খ্রিস্টান শাসকেরা পুনরুদ্ধার করে আইবেরিয় উপদ্বীপ অঞ্চল।

কুইজ!

কতটুকু জানতে পারলেন আল-আন্দালুস সম্পর্কে? ঝালাই করে নিতে কুইজটি খেলতে পারেন।

  • Question of

    আল-আন্দালুসের রাজধানী গড়ে উঠেছিল কোন শহরে?

    • কর্দোবা
    • গ্রানাডা
    • সেভিয়ে
  • Question of

    আলকাজার শব্দটি আরবি যে শব্দ থেকে এসেছে তার অর্থ কী?

    • দুর্গ
    • প্রাসাদ
    • উপাসনালয়
  • Question of

    আন্দালুসের বিখ্যাত ব্যক্তি আভিরোসের প্রকৃত নাম কী?

    • ইবনে রুশদ
    • আবু রুশদ
    • আল রুশদ
  • Question of

    আলকাজার প্রাসাদটি কোন জনপ্রিয় সিরিজে সেট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে?

    • গেম অফ থ্রোনস
    • হাউজ অফ কার্ডস
    • টাইম অফ হুইল
  • Question of

    যে বিখ্যাত খলিফার লাইব্রেরিতে চার লক্ষাধিক বই ছিল, তার নাম কী?

    • আল হাকাম
    • আব্দুর রহমান
    • তারিক ইবনে জিয়াদ

Written by ABMSaeid

Lifelong appreciator of history and human beings.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গ্র্যান্ড থেফট অটো

যীশুর জন্ম ও ফিলিস্তিনে রোমান সাম্রাজ্য